গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক কারা গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের কাজ, দক্ষতা ও ভূমিকা আলোচনা করুন[/caption]
১.ভূমিকা: গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা। গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক কোনো নির্দিষ্ট গণমাধ্যমের সার্বিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ, পরিকল্পনা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, পণ্য উৎপাদন ও মানোন্নয়ন এবং বিপণন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনা করেন। গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের দক্ষতা, কার্যাবলী ও ভূমিকা নিম্নে আলোচনা করা হলো-
২.গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা-গণমাধ্যম পণ্য উৎপাদনের কার্যাবলী বোঝাতে ম্যানেজমেন্ট প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে গণমাধ্যমের পণ্য উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ কর্মপ্রক্রিয়ার পরিচালনাকে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা বলে। মূলত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া, পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা সেই সাথে পণ্যসমুহ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম হাউজের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাই হলো গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা।
৩.গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক-গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক হলো সেই ব্যক্তি, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বস্ততার সাথে মনিটরিং বা তত্ত্বাবধান করেন, গণমাধ্যমটির উন্নয়নে অবদান রাখেন এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বিক দিক নির্দেশনা দান করেন। গণমাধ্যম পণ্য, পণ্যের বাজারজাতকরণ, গণমাধ্যমের নীতি নির্ধারণ, পণ্যের মানোন্নয়ন ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের সাথে ব্যবস্থাপকের ভূমিকা রাখে। এই কাজগুলো যার দ্বারা পরিচালিত হয় তাকেই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
৪.গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক সম্পর্কে J. D Bigelow Zvui Managerial Skills: Exploration in Practical Knowledge বইতে বলেন “গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পূর্বানুমান ও পরিকল্পনা, সংগঠিত করা, আদেশ ও নির্দেশ দেওয়া, সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি যার হাত ধরে হয় তিনিই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক।” Seanlan Burt & Keys Barnard তাঁদের Leadership in Media Management বইতে বলেন, “গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কতিপয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত সকল মানবীয় ও কারিগরি সম্পদের সমন্বয় ও সংহতি কার্য যাদের হাত ঘুরে পরিচালিত হয় তারাই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক।
অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানেরও কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। আর এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকান্ডে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যিনি নিয়োজিত থাকেন তিনিই হলেন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক। অর্থাৎ গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমটির যাবতীয় প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন।
৫.গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের শ্রেণীবিভাগ- গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপক দায়িত্ব পালন করেন। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাধারণত তিন ধরনের ব্যবস্থাপক থাকেন। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এল এ এলেন তাঁর Management and Organization বইয়ে তিন ধরনের গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের উল্লেখ করেন।
এগুলো হলোঃ
ক.Top Level Managers বা উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপক
খ. Middle Level Managers বা মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক
গ.Lower Level Managers বা নিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপক
ক. Top Level Managers বা উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপক- এই পর্যায়ের ব্যবস্থাপকরা গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য, প্রতিষ্ঠা, নীতি নির্ধারণ, পরিকল্পনা গ্রহণ ও পর্যবেক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পরিচালকমণ্ডলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাধারণ ব্যবস্থাপক ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ এ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকের আওতাভূক্ত।
খ.Middle Level Managers বা মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক- উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ, নির্দেশ প্রদান, সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এ পর্যায়ের অন্তর্ভূক্ত।
গ. Lower Level Managers বা নিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপক- যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ পর্যায়ের অন্তর্ভূক্ত। কর্মীদের কাজ তদারক করা হলো এদের কাজ।
গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের দক্ষতা- প্রতিষ্ঠানকে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের কিছু দক্ষতা অর্জন করতে হয়।
এগুলো হলো-
ক.প্রাযুক্তিক দক্ষতা খ.মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা গ. সমস্যা সমাধানে দক্ষতা ঘ. অর্থনৈতিক দক্ষতা ঙ. বাজারজাতকরণ দক্ষতা
ক.প্রাযুক্তিক দক্ষতা- যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে মানুষ অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর। প্রযুক্তির ওপর এই ব্যাপক নির্ভরশীলতা কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যাম্ভাবী হয়ে পড়েছে। কাজেই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে যথাযথভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রাযুক্তিকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠা প্রয়োজন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্যবস্থাপককে পণ্য, সেবা, যন্ত্রপাতি সম্পর্কিত ধারণা রাখতে হবে। উপযুক্ত কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে না পারলে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে অসমর্থ হবেন। বর্তমানে গণমাধ্যমগুলো অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে এবং এর ধারা প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। সেজন্য একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে অনেক বেশি কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে হয়। যে কোনো ধরনের গণমাধ্যম প্রযুক্তি পরিচালনা, সিগন্যাল প্রেরণ, প্রোগ্রাম আদান-প্রদান, কম্পিউটার সংক্রান্ত দক্ষতা থাকার বিকল্প নেই। একজন ব্যবস্থাপক যদি প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন তাহলে প্রযুক্তি এবং প্রতিযোগিতার এই যুগে তাঁর প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে সমর্থ হবে।
খ.মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা- এটি হলো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তি এবং দল উভয়ের সাথে কাজ করার সামর্থ্য থাকা। শক্তিশালী যোগাযোগীয় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কর্মক্ষমতাকে সর্বদা চাঙ্গা রাখবেন। একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে এজন্য অবশ্যই প্রাণবন্ত, উজ্জীবীত, প্রণোদিত হতে হবে। তিনি কর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে যেনো প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যায় কর্মীদের মধ্যে সেই মনোভাব সৃষ্টি করবেন। মানবীয় দক্ষতার ক্ষেত্রে তিনি কোনো একজনকে আলাদা গুরুত্ব দেবেন না। সকল কর্মীকে তিনি সমান সুযোগ ও গুরুত্ব দেবেন।
গ. সমস্যা সমাধানে দক্ষতা- বিশ্লেষণগত ধারণা বা সমস্যা সমাধান দক্ষতা বিভিন্ন চাকরি, সৃজনশীল পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দক্ষতা বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাকে সে সমস্যা ভালভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং ধীর মস্তিষ্কে তা সমাধানের উপায় বের করতে হবে। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে তার কার্যক্রমে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আনতে হয়। আবার দর্শক-শ্রোতার পছন্দের পরিবর্তন আসতে পারে, দর্শক-শ্রোতার মধ্যে সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে গণমাধ্যম হাউজকে গতিশীল রাখার জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকতে হবে।
ঘ. অর্থনৈতিক দক্ষতা- যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে সবার আগে অর্থ প্রয়োজন। শুধু অর্থ থাকলেই হবে না সে অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করার দক্ষতা থাকতে হবে। গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সঠিকভাবে বুঝতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে পরিমান অর্থ প্রয়োজন প্রথমে তা নিরূপণ করতে হবে এবং অর্থ কোন কোন খাতে কীভাবে ব্যয় হবে তা স্থির করতে হবে। সবশেষে পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবে অর্থ ব্যয় হয়েছে কি না তার জন্য হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। মোট কথা প্রয়োজনীয় বাজেট প্রণয়ন, আয়-ব্যয় সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
ঙ. বাজারজাতকরণ দক্ষতা- একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মানবসম্পদ যেমন যোগান দিতে হয় তেমনি শুধু পণ্য বা আধেয় উৎপাদন করলেই হয় না। তা গ্রাহক দর্শক-শ্রোতার নিকট ঠিকমতো পৌঁছাতে হয়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা প্রচার কীভাবে করা হবে, পণ্যের মূল্য কেমন হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে ইত্যাদি বিষয় অনুধাবন করতে হয়। উৎপাদিত পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যাবতীয় বিষয়ের প্রতি গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে লক্ষ্য রাখতে হয়।
গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের কার্যাবলী-একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে যে সকল কার্যাবলী সম্পাদন করতে হয় সেগুলো হলো:
ক.Planningপরিকল্পনা খ.Organizing সংগঠিতকরণ গ. Motivation প্রেষণা বা প্রেরণা ঘ. Controlling নিয়ন্ত্রণ
ক. Planning পরিকল্পনা- এটি গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার এমন একটি কাজ যা লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করে এবং উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সাহায্য করে। পরিকল্পনা ব্যবস্থাপককে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত অবস্থা এবং ভবিষ্যত পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করে। পরিকল্পনার জন্য ব্যবস্থাপককে ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের জন্য পরিকল্পনা একটি মৌলিক ও প্রথম কাজ।
সি রেভেজ উল্লেখ করেছেন, ‘গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কীভাবে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল করবে তার জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হয়।
প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উপাদান ও সম্ভাব্য উপায়ের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কী করতে হবে, কীভাবে ও কার দ্বারা করতে হবে, কখন ও কত সময়ে করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই পরিকল্পনা বলে।’ গণমাধ্যমের পণ্য হলো সংবাদ, ম্যাগাজিন, বই, ভিডিও, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। এই পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যাবতীয় কাজ সম্পাদনের জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে সুপরিকল্পিতভাবে এগোতে হয়।
খ.Organizing সংগঠিতকরণ- সংগঠিতকরণ ব্যবস্থাপনার এমন কাজ যা সাংগঠনিক কাঠামোকে মজবুত করে এবং পণ্যের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের অন্যতম কাজ হলো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত জনশক্তি ও অন্যান্য উপায়। উপাদানগুলোকে সংগঠিত করে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা ব্যবস্থাপকের উপরই বর্তায়।
এজন্য একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের প্রথমেই কী কাজ হবে সেগুলোতে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে ব্যক্তি বা বিভাগের দায়িত্ব কী হবে এবং কতটুকু ক্ষমতা তাকে দিতে হবে তা নির্ধারণ করতে হয়। সবশেষে যে সকল ব্যক্তি, বিভাগ বা উপবিভাগ থাকবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক কী হবে অর্থাৎ উর্ধ্বতন বা অধস্তন ঠিক করে দেন।
গ. Motivation প্রেষণা বা প্রেরণা- প্রেষণা হলো মানুষকে বিশেষ উদ্দেশ্যে প্ররোচিত করা। এখানে যোগাযোগ হলো বড় একটি নিয়ামক। প্রেষণা বুঝিয়ে দেয় কোনো কিছু মানুষকে অন্যদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। কর্মীদের কার্যক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদের অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত ও প্ররোচিত করার প্রক্রিয়াই প্রেষণা। কর্মীদের শুধু দিক নির্দেশনা দিলেই হবে না, তারা যেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে কাজটি সম্পন্ন করে সেজন্য তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং আগ্রহ ধরে রাখার জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে প্রয়াস চালাতে হয়।
ব্যবস্থাপনার প্রেষণা প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি বিষয় হলো-
ক. Leadership খ. Group Dynamics গ. Communication ঘ. Organizational Change
ঘ. Controlling নিয়ন্ত্রণ-একটি গণমাধ্যম কোম্পানী কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কাজের পরিবেশ রক্ষার জন্য যোগাযোগকে ব্যবহার করে। লিখিত নীতিমালা কর্মীদের কর্মস্থলের নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য করে। কার্যত পরিকল্পনার আলোকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কার্যাদি সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা মূল্যায়ন, দোষ-ত্রুটি নিরূপণ, কারণ নির্ণয় এবং তা বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনীমূলক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ বলে।
গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের এ চারটি কাজকে কিছু তাত্ত্বিক P-O-M-C মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা এই মডেলের যথার্থ পরিকল্পনা করা, সংগঠিত করা, প্রণোদিত করা ও নিয়ন্ত্রণ করা এগুলোকেই ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ বলে অভিহিত করেছেন।
Alan B. Albarren বলেন, একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে প্রাথমিক চার কাজের বাইরে আরো চারটি কাজ অত্যাবশ্যকীয়ভাবে করতে হয়।
যথা- ১) Monitoring বা পর্যবেক্ষণ ২) Facilitating বা সুযোগ তৈরি করা ৩) Communicating বা যোগাযোগ ৪) Negotiating বা আলোচনা
১) Monitoring বা পর্যবেক্ষণ- গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে অবশ্যই নজর রাখতে হবে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অনুযায়ী যথাযথভাবে এগোচ্ছে কি না এবং এক্ষেত্রে কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে তা নিরসনে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। কর্মীদের যাবতীয় সুবিধা-অসুবিধার প্রতিও ব্যবস্থাপককে খেয়াল রাখতে হয়। ১৯৯১ সালে গধহধমবৎরধষ ঝশরষষং: ঊীঢ়ষড়ৎধঃরড়হং রহ চৎধপঃরপধষ কহড়ষিবফমব বইয়ে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পর্কে যদি ব্যবস্থাপকের নজরদারি না থাকে তাহলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে।’
২) Facilitating বা সুযোগ তৈরি করা- প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে অবশ্যই কর্মীদের যথার্থ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কর্ম সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান নিশ্চিত করতে হবে। যেমন-অর্থ, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যাতে কাজ করার জন্য উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত হয় সে সুযোগ তৈরি করা গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব।
৩) Communicating বা যোগাযোগ- প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা ধরনের মানুষের সাথে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে যোগাযোগ করতে হয়। যে ব্যবস্থাপকের যোগাযোগ দক্ষতা যত বেশি সে ব্যবস্থাপকের সফলতাও তত বেশি হবে। প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের আবহ ঠিক রাখতে হয় এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথেও কার্যকর যোগাযোগ রাখতে হয়। যে কোনো পর্যায়ে যোগাযোগ ঘাটতি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত করতে হয়।
৪) Negotiating বা আলোচনা- গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে করতে হয়। দর্শক-শ্রোতা, মতমোড়ল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথেও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা করতে হয়। মোট কথা, বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রাকে সুষমভাবে এগিয়ে নেওয়া গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের একটি অন্যতম কাজ।
গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের ভূমিকা- গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের ভূমিকা সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। কেউ বলেন, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ, তথ্য প্রদান, সিদ্ধান্ত প্রদান ইত্যাদিতে ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যদিকে Alan B. Albarren বলেন, একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে দৈনন্দিন কার্যক্রমে মূলত তিন ধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়-
ক. নেতৃত্ব- কোনো কার্যক্রম পরিচালনাকারীর অবশ্য প্রয়োজনীয় গুণ বা দক্ষতা এটি। নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বা যোগ্যতা গনমাধ্যম ব্যবস্থাপকের জন্য অপরিহার্য কেননা গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত থাকেন। একজন সফল কিংবা দক্ষ গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক হতে হলে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী থাকতেই হবে।
খ. প্রতিনিধিত্ব-গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধির ভূমিকা পালন করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠান, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে গণমাধ্যমের চুক্তি স্বাক্ষর, পণ্যের মান সম্পর্কে ভোক্তা-বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বক্তব্য তুলে ধরা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়।
গ. সংযোগ সাধন-বর্তমানে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এদের অধিকাংশই কোনো না কোনো বাণিজ্যিক করপোরেশনের অংশ। ফলে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো গণমাধ্যমের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য গণমাধ্যম বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সংযোগ রক্ষা করা। কারণ একই মালিকানার অন্তর্গত গণমাধ্যমগুলোকে সাধারণত একই নীতিমালা তুলে ধরতে হয়। এছাড়া গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে নিয়মিত মালিক, পরিবেশক, শেয়ার হোল্ডারদের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথেও সমন্বয় করতে হয়।
উপসংহার- গণমাধ্যমের কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য যে ব্যক্তিটি অপরিহার্য তিনি হলেন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক। দক্ষ গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক ছাড়া কোনোভাবেই গণমাধ্যম তাঁর কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। তাই কোনো গণমাধ্যম সুষ্ঠুভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়ার জন্য দক্ষ গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকের বিকল্প নেই।
গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা কী
